নতুন

[getBreaking results="4" label="recent"]

ছবি কাকে বলে - অশোক মিত্র

অশোক মিত্র রচিত 'ছবি কাকে বলে' বইয়র প্রচ্ছদ

ছবি কাকে বলে
অশোক মিত্র
**********
চিত্রকলা দেখতে আমরা সবাই জানি, কিন্তু ছবি দেখতে জানি কি? একটি ছবি সুন্দর কেন, একটি চিত্রকর্মকে মহৎ করে তোলে কী, রং, রেখা, আলো-ছায়া, আকার ও বিন্যাস কীভাবে ছবির অর্থ তৈরি করে—এই আপাত সহজ অথচ গভীর প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছেন অশোক মিত্র তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শিল্পবিষয়ক গ্রন্থ ‘ছবি কাকে বলে’-তে। বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৮৩ সালে; আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত বর্তমান সংস্করণটি ২৩২ পৃষ্ঠার।

অশোক মিত্র (১৯২৮–২০১৮) মূলত অর্থনীতিবিদ ও প্রশাসক হিসেবে খ্যাত হলেও শিল্প-সমালোচক হিসেবেও তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ভারতের আদমশুমারি ও জনসংখ্যা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন এবং পরে চিত্রকলার ইতিহাস ও নন্দনতত্ত্ব নিয়ে সহজবোধ্য ভাষায় লিখেছেন। ‘পশ্চিম ইউরোপের চিত্রকলা’, ‘ভারতের চিত্রকলা’ এবং ‘ছবি কাকে বলে’ তাঁর শিল্পবিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ১৯৯৪ সালে তিনি রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হন।

বইটির প্রেরণা এসেছিল আমেরিকান শিল্পসংগ্রাহক ও শিল্পতাত্ত্বিক অ্যালবার্ট সি. বার্নসের ‘The Art of Painting’/চিত্রদর্শনধর্মী ভাবনা থেকে। তবে মিত্রের লক্ষ্য ছিল কোনো দুরূহ শিল্পতত্ত্ব বাংলায় অনুবাদ করা নয়; বরং সাধারণ পাঠককে ছবি দেখতে ও বুঝতে শেখানো। তাই বইটি শিল্প-সমালোচনার পাশাপাশি এক ধরনের চিত্রদর্শনের পাঠশালা।

গ্রন্থে ছবি দেখার প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে ফর্ম, টেকনিক, রেখা, রং, আলো-ছায়া, কম্পোজিশন, নকশা, রসবোধ ও চিত্রের উপাদান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর ‘দেখা’ সম্পর্কে ধারণা। চোখের সামনে ছবি থাকা আর ছবির মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকে সত্যিকার অর্থে দেখতে পারা এক বিষয় নয়। পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও শিল্পবোধ আমাদের দেখার ক্ষমতাকে কীভাবে গভীর করে, লেখক তা অত্যন্ত সহজ উদাহরণে বোঝান।

বইয়ের আলোচনায় পাশ্চাত্যের নানা শিল্পী ও শিল্পধারার পাশাপাশি ভারতীয় শিল্পেরও প্রসঙ্গ এসেছে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো, বেলিনি, জিওত্তো, এল গ্রেকো, মোনে, সেজান, মাতিস, পিকাসো প্রমুখের সঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পভাবনাকেও আলোচনায় আনা হয়েছে। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন—একজন শিল্পী একই বিষয়কে অন্য শিল্পীর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কেন দেখেন ও প্রকাশ করেন।

বইটির বিশেষ আকর্ষণ এর প্রায় পঞ্চাশটি চিত্র-উদাহরণ। শুধু তত্ত্ব দিয়ে ছবি বোঝানো হয়নি; নির্বাচিত চিত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে লেখক দেখিয়েছেন, কোথায় চোখ রাখতে হবে, কীভাবে ছবির গঠন বিচার করতে হবে এবং কোন বৈশিষ্ট্যটি একজন শিল্পীকে স্বতন্ত্র করে তোলে। অজন্তার চিত্রকলার উপরও রয়েছে একটি পৃথক আলোচনা।

সবচেয়ে বড় কথা, ‘ছবি কাকে বলে’ ছবি আঁকার বই নয়—ছবি দেখার বই। শিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু ‘ভালো লাগল’ বা ‘ভালো লাগল না’ বলার পরিবর্তে কেন ভালো লাগছে, শিল্পী কীভাবে সেই অনুভূতি তৈরি করেছেন, তার উত্তর খুঁজতে শেখায় বইটি। তাই চিত্রকলার ইতিহাস বা নন্দনতত্ত্বে বিশেষ পূর্বজ্ঞান না থাকলেও যে কোনো শিল্পপ্রেমী পাঠকের জন্য এটি একটি মূল্যবান ও দীর্ঘস্থায়ী পাঠ। 

0/Post a Comment/Comments

প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।

নবীনতর পূর্বতন