নতুন

[getBreaking results="4" label="recent"]

শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ - রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ
রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী
সম্পাদনাঃ ড. প্রদীপ রায়
----------
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান, দর্শন ও মননশীল প্রবন্ধচর্চার ইতিহাসে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী একটি অনন্য নাম। তাঁর নির্বাচিত রচনাগুলো নিয়ে ড. প্রদীপ রায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ গ্রন্থটি তাই কেবল প্রবন্ধের সংকলন নয়; উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ার বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক জগতেরও একটি মূল্যবান দলিল। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে গ্রন্থটির প্রথম সম্পাদকীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে; ৩০৪ পৃষ্ঠার এই সংকলনে ত্রিবেদীর বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম, সমাজ, সাহিত্য ও ইতিহাসবিষয়ক মোট ২৩টি রচনা নির্বাচিত হয়েছে।

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর জন্ম ২০ আগস্ট ১৮৬৪ মুর্শিদাবাদের কান্দিতে এবং মৃত্যু ৬ জুন ১৯১৯। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে অনার্সসহ বি.এ. এবং পরে পদার্থবিদ্যায় এম.এ. করেন। ১৮৯২ সালে রিপন কলেজে বিজ্ঞানশাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে অধ্যক্ষ হন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

এই জীবনপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ত্রিবেদীর লেখায় বিজ্ঞান ও দর্শনের আশ্চর্য সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর সময়টি ছিল ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক যুগ; পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও দর্শনের নতুন ধারণা তখন শিক্ষিত বাঙালি সমাজে দ্রুত প্রবেশ করছে। ডারউইনের বিবর্তনবাদ, আধুনিক ভূতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের নানা আবিষ্কার মানুষের প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছিল। ত্রিবেদী সেই নতুন জ্ঞানকে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

‘পৃথিবীর বয়স’ প্রবন্ধে ভূতত্ত্ব, প্রাণিতত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিদ্যার আলোকে পৃথিবীর উৎপত্তি ও বয়স নির্ণয়ের বিভিন্ন মত আলোচনা করা হয়েছে। আর ‘জ্ঞানের সীমানা’-য় মানুষের জ্ঞান কীভাবে ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন আবিষ্কার কীভাবে অজানার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে তুলছে, সেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞান যত বাড়ে, অজানার জগতও যেন তত বড় হয়ে ওঠে।

‘সুখ না দুঃখ?’-এ জীবনে সুখ ও দুঃখের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে দার্শনিক বিতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ‘সৌন্দর্য-তত্ত্ব’-এ সৌন্দর্যকে কেবল চোখের আনন্দ হিসেবে না দেখে তার মানসিক, সামাজিক ও জীবনঘনিষ্ঠ তাৎপর্য অনুসন্ধান করেছেন লেখক। ‘প্রজ্ঞার জয়’-এ মানুষের বিশেষ শক্তি হিসেবে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, জ্ঞান এবং বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন।

গ্রন্থে বিজ্ঞান ও দর্শনের পাশাপাশি ‘জীবন ও ধর্ম’, ‘ধর্মের প্রমাণ’, ‘প্রকৃতি-পূজা’, ‘বৈরাগ্য’, ‘মুক্তির পথ’ প্রভৃতি রচনায় ধর্ম, বিশ্বাস ও মানবজীবনের সম্পর্কও বিচার করা হয়েছে। আবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও ম্যাক্সমুলারের মতো ব্যক্তিত্বকে নিয়ে রচনাগুলো ত্রিবেদীর ইতিহাসচেতনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়।

রামেন্দ্রসুন্দরের বিশেষ কৃতিত্ব হলো—তিনি বৈজ্ঞানিকের মতো তথ্য সংগ্রহ করেছেন, দার্শনিকের মতো প্রশ্ন তুলেছেন এবং সাহিত্যিকের মতো তা প্রকাশ করেছেন। তাঁর সময়ের তুলনায় এমন বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর ও কুসংস্কারমুক্ত চিন্তার প্রকাশ বাংলা গদ্যে ছিল অত্যন্ত অভিনব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাতেও তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধে জ্ঞানপিপাসা থেকে দর্শনচিন্তায় উত্তরণের এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’ বাংলা মননের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। পৃথিবী, মানুষ, জ্ঞান, সৌন্দর্য, ধর্ম ও সভ্যতা সম্পর্কে এক শতাব্দীরও বেশি আগে একজন বাঙালি বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্যিক কীভাবে প্রশ্ন করেছিলেন—এই বই তারই চমৎকার সাক্ষ্য। আজকের পাঠকের কাছে তাই এটি শুধু অতীতের সাহিত্য নয়; যুক্তি, অনুসন্ধান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চারও এক মূল্যবান পাঠ।

0/Post a Comment/Comments

প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।

নবীনতর পূর্বতন