নতুন

[getBreaking results="4" label="recent"]

সেই প্রেম- দোমিনিক লাপিয়ের

দোমিনিক লাপিয়ের লিখিত 'সেই প্রেম' বইয়ের প্রচ্ছদ
সেই প্রেম
দোমিনিক লাপিয়ের
--- ------------ -------
দোমিনিক লাপিয়েরের ‘সেই প্রেম’ এমন এক মানবিক আখ্যান, যেখানে প্রেম কোনো বিচ্ছিন্ন রোমান্টিক অনুভূতি নয়; বরং ইতিহাস, দারিদ্র্য, অসহায়তা, সামাজিক বাস্তবতা ও জীবনযন্ত্রণার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। লাপিয়েরের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বৃহৎ ইতিহাসকে তিনি সাধারণ মানুষের জীবন দিয়ে দেখতে ভালোবাসেন। মানুষের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়েই তাঁর কাছে সমাজ ও সময়ের বৃহত্তর চিত্র ফুটে ওঠে। কলকাতার দরিদ্র মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর লেখাতেও এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।

লাপিয়ের ছিলেন ফরাসি লেখক ও সাংবাদিক। সাংবাদিকসুলভ অনুসন্ধিৎসা তাঁকে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের জীবন ও সামাজিক বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল। ফলে তাঁর রচনায় প্রেমের পাশাপাশি দারিদ্র্য, রোগ, সামাজিক বৈষম্য, ধর্ম, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি বৃহত্তর সময় ও সমাজের পটভূমিতে স্থাপন করেন।

‘সেই প্রেম’-এর বিশেষ আকর্ষণ এখানেই যে, প্রেম এখানে শুধু মিলনের আনন্দ নয়; অপ্রাপ্তি, বিচ্ছেদ, ত্যাগ, দুঃখ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েও প্রেমের অস্তিত্ব অনুভূত হয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা যখন মানুষের স্বাভাবিক আনন্দকে কেড়ে নেয়, তখন ভালোবাসাই কখনো হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার শক্তি। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বইটিকে নিছক প্রেমকাহিনি না রেখে মানুষের জীবনসংগ্রামের একটি সংবেদনশীল দলিলে পরিণত করেছে।

বইয়ের একটি বিশেষভাবে মর্মস্পর্শী ঘটনা হলো—এক পিতা তাঁর যক্ষ্মা রোগের কথা লুকিয়ে রাখতে পান খাওয়া শুরু করেন। কাশির সঙ্গে রক্ত উঠে এলে যাতে পরিবারের মানুষ বুঝতে না পারে যে তিনি রক্তবমি করছেন, তার বদলে যেন মনে হয় তিনি পান খেয়ে লাল পিক ফেলেছেন—এই কৌশল অবলম্বন করেন তিনি। ঘটনাটি একই সঙ্গে করুণ ও গভীরভাবে মানবিক। এখানে পান কোনো অভ্যাস নয়; অসুস্থতাকে আড়াল করার এক অসহায় উপায়। পিতা নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ না করে প্রিয়জনদের ভয় ও দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখতে চান। তাঁর এই আত্মগোপন তাই একদিকে পিতৃস্নেহের পরিচয়, অন্যদিকে সমাজে রোগ ও দারিদ্র্যকে ঘিরে থাকা ভয় ও লজ্জারও প্রতিচ্ছবি। রোগ শরীরকে যেভাবে কষ্ট দেয়, সামাজিক বাস্তবতা কখনো মানুষকে সেই কষ্টটুকুও প্রকাশ করতে দেয় না—এই ছোট ঘটনাটির মধ্যে তার অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে।

লাপিয়েরের মানবিকতার জায়গাটি এখানেই সবচেয়ে শক্তিশালী। তিনি ইতিহাসের বড় ঘটনা বা সমাজের বড় কাঠামোর কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তাঁর দৃষ্টি ফিরে আসে ব্যক্তিমানুষের কাছে। একটি অসুস্থ পিতা, তার পরিবার, তাদের ভয়, ভালোবাসা এবং টিকে থাকার চেষ্টা—এসব ছোট ছোট ঘটনা বৃহত্তর মানবিক সত্যকে প্রকাশ করে।

সব মিলিয়ে ‘সেই প্রেম’ শুধু প্রেমের গল্প নয়; এটি মানুষের অসহায়তা, আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প। ইতিহাস ও সমাজের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও মানুষ কীভাবে প্রিয়জনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়, কীভাবে নিজের কষ্ট গোপন করে অন্যের মুখে হাসি রাখতে চায়—বইটির আবেগের গভীরতা সেখানেই। লাপিয়েরের লেখায় প্রেম তাই কোনো বিলাসী অনুভূতি নয়; বরং দুঃখ ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়। 

0/Post a Comment/Comments

প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।

নবীনতর পূর্বতন