আহমদ ছফাকে আমরা মূলত চিনে থাকি তাঁর তীক্ষ্ণ প্রবন্ধ, উপন্যাস ও সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ে গভীর চিন্তার জন্য। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক সত্তার আরেকটি কোমল দিক দেখা যায় শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ বইটিতে। ১৯৬৮ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বইটি আকারে ছোট হলেও ছফার কল্পনাশক্তি ও গল্প বলার স্বাতন্ত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় বহন করে।
বইটির গল্পগুলো একই ধরনের নয়। কোথাও রূপকথার আবহ, কোথাও লোককথার স্বাদ, কোথাও রহস্য ও অদ্ভুত ঘটনার আকর্ষণ, আবার কোথাও স্বপ্ন ও কল্পনার বিস্তার। এই বৈচিত্র্যই বইটিকে একঘেয়ে হতে দেয়নি। ছফা শিশুদের জন্য লিখতে গিয়ে তাদের কেবল নীতিশিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং তাদের বিস্মিত করতে, ভাবতে এবং পরিচিত বাস্তবতার বাইরে কল্পনার একটি পৃথিবীতে যেতে উৎসাহিত করেছেন।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর কল্পনাময়তা। শিশুর কাছে পৃথিবী এখনও সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাত নয়—তাই একটি পুতুল, একটি ফুল, একটি অদ্ভুত ঘটনা কিংবা দূরের কোনো পৃথিবীও তার কাছে বিস্ময়ের বিষয় হতে পারে। ছফা সেই বিস্ময়বোধকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে গল্পগুলো পড়তে গিয়ে শিশুর মনে শুধু ‘কী ঘটল’—এই প্রশ্ন নয়, ‘আর কী হতে পারে’—এই প্রশ্নও জেগে ওঠে।
বইটির গল্পগুলো একই ধরনের নয়। ‘আমির সওদাগর’, ‘সোনা পুতুল’, ‘ঘোড়া চুরির সাক্ষী’, ‘দুটি মর্মর মূর্তির কাহিনী’, ‘স্বপ্ন সমুদ্দুর’ এবং ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’—প্রতিটি গল্পের আবহ ও কাহিনির স্বাদ আলাদা। কোথাও লোককথা ও রূপকথার মায়া, কোথাও হাস্যরস ও কৌতূহল, কোথাও রহস্যময়তা, আবার কোথাও স্বপ্ন ও কল্পনার বিস্তার। ফলে এক গল্প থেকে আরেক গল্পে যেতে পাঠকের সামনে যেন নতুন একটি দরজা খুলে যায়। এই বৈচিত্র্যই বইটিকে শিশু-কিশোরদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলে।
বিশেষ করে ‘সোনা পুতুল’ ও ‘দুটি মর্মর মূর্তির কাহিনী’-তে কল্পনার বিস্তার, ‘ঘোড়া চুরির সাক্ষী’- তে গল্প বলার রস, আর ‘স্বপ্ন সমুদ্দুর’- এ স্বপ্ন ও অজানার প্রতি আকর্ষণ বইটির আলাদা আলাদা স্বর তৈরি করেছে। শিরোনাম গল্প ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ আবার বইটির সামগ্রিক আবহের সঙ্গে এক ধরনের কোমলতা ও কাব্যিক অনুভূতি যোগ করে। গল্পগুলোর এই বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই আহমদ ছফা শিশুদের পরিচিত বাস্তবতার পাশাপাশি কল্পনার একটি বিস্তৃত জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চেয়েছেন।
তার পরও ‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আহমদ ছফার পরিচিত কঠিন ও তর্কপ্রবণ লেখকসত্তার বাইরে একটি স্বপ্নময় মানুষকে সামনে আনে। এখানে তিনি শিশুকে ছোট পাঠক হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন কল্পনা ও বিস্ময়ে পূর্ণ একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর শিশুর কাছেও বইটির আবেদন তাই শেষ হয়ে যায়নি। এটি তাকে ধীর হতে, গল্প শুনতে এবং নিজের কল্পনাকে কাজে লাগাতে শেখায়। আর প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছে বইটি হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের দিকে ফিরে তাকানোর একটি সুন্দর উপলক্ষ।
‘দোলো আমার কনক চাঁপা’ তাই শুধু শিশু-কিশোরদের গল্পের বই নয়; এটি আহমদ ছফার সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের একটি কোমল, কল্পনাময় এবং অপেক্ষাকৃত অপরিচিত অধ্যায়।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।