নতুন

[getBreaking results="4" label="recent"]

সৈয়দ মুজতবা আলী - পঞ্চতন্ত্র

সৈয়দ মুজতবা আলী - পঞ্চতন্ত্র
সৈয়দ মুজতবা আলী
পঞ্চতন্ত্র
======================
সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পঞ্চতন্ত্র’কে শুধু ভ্রমণকাহিনি বললে বইটির বৈচিত্র্য কিছুটা আড়ালে পড়ে যায়। এটি মূলত রম্যরচনা, গল্প, স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ ও ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার এক বিচিত্র সংকলন। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে এবং এর রচনাগুলোর বড় অংশ আগে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। লেখক নিজেই জানিয়েছেন, বইয়ের অধিকাংশ লেখা ‘স্বমূর্তি’ ও সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবনই ছিল এক অর্থে বিশ্বভ্রমণের প্রস্তুতি। ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৪ সালে সিলেটের করিমগঞ্জে জন্ম তাঁর। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা, কাবুলে অধ্যাপনা, জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা, মিশরের আল-আজহারে অধ্যয়ন এবং পরবর্তীকালে বরোদা, কলকাতা, দিল্লি ও শান্তিনিকেতনে কর্মজীবন—সব মিলিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার পরিসর ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। তিনি বহু ভাষায় দক্ষ ছিলেন; ফলে বিদেশি মানুষ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তিনি শুধু পর্যটকের চোখে দেখেননি, দেখেছেন একজন ভাষাবিদ ও সংস্কৃতিসন্ধানীর দৃষ্টিতে।

‘পঞ্চতন্ত্র’- এর ভ্রমণজগতও তাই নিছক স্থান-পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কায়রো, ইউরোপ, বরোদা, কলকাতা—বিভিন্ন জায়গার মানুষ, সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতি তাঁর লেখায় এসে মিশেছে। কোথাও বিদেশি শহরের দৈনন্দিন জীবন, কোথাও মানুষের অদ্ভুত স্বভাব, কোথাও ইতিহাসের ঘটনা, আবার কোথাও সমকালীন রাজনীতি—সবকিছুই তাঁর রসিক দৃষ্টিতে নতুন অর্থ পায়। কায়রোর কাফেতে স্যুট বানানোর দরদাম থেকে শুরু করে হিটলার-চেম্বারলেনের রাজনৈতিক দর-কষাকষির প্রসঙ্গকে একই রসাত্মক ভঙ্গিতে পাশাপাশি এনে দেওয়ার মধ্যেই তাঁর লেখার স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে।

তবে হাসির আড়ালে বইটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে—ইতিহাস ও সমাজ পর্যবেক্ষণ। মুজতবা আলী কোনো দেশ বা জাতিকে দূর থেকে বিচার করেন না; মানুষের সঙ্গে মিশে তাঁদের জীবনযাপন, সংস্কার, খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, রসবোধ ও সামাজিক সম্পর্ককে দেখেন। ফলে ভ্রমণ তাঁর কাছে পর্যটন নয়, মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি পদ্ধতি। তাঁর লেখায় ইতিহাসও নিছক সাল-তারিখের তালিকা নয়; ইতিহাস জীবন্ত হয়ে ওঠে মানুষের গল্পের মধ্য দিয়ে।

এই কারণেই ‘পঞ্চতন্ত্র’ পড়তে গিয়ে পাঠক একদিকে যেমন হাসেন, অন্যদিকে তেমনি নতুন নতুন দেশ, মানুষ ও সভ্যতা সম্পর্কে জানতে পারেন। লেখকের পাণ্ডিত্য কখনো ভারী হয়ে ওঠে না; আড্ডার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তিনি ইতিহাস, সাহিত্য, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা তথ্য পরিবেশন করেন। তাঁর এই মজলিসি গদ্য বাংলা রম্যসাহিত্যে একেবারেই স্বতন্ত্র।

সব মিলিয়ে ‘পঞ্চতন্ত্র’ ভ্রমণকে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও রসের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার এক অসাধারণ গ্রন্থ। পৃথিবীকে দেখার পাশাপাশি মানুষকে বোঝা, ইতিহাসকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং কঠিন তথ্যকেও হাস্যরসের মাধ্যমে উপভোগ্য করে তোলাই এর প্রধান সার্থকতা। মুজতবা আলীর বিশ্বদর্শন ও বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হিসেবে বইটি আজও বাংলা সাহিত্যে অনন্য।

0/Post a Comment/Comments

প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।

নবীনতর পূর্বতন