সরল বাঙ্গালা অভিধান
সুবল চন্দ্র মিত্র
##########
বাংলা অভিধানের ইতিহাসে সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কলকাতা থেকে গ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ১৯০৬ সালে। বিশ শতকের শুরুতে আধুনিক পদ্ধতির একভাষিক বাংলা-বাংলা অভিধানচর্চার যে নতুন পর্ব শুরু হয়, সুবলচন্দ্রের এই অভিধান তার অন্যতম প্রধান নিদর্শন। বাংলা অভিধানচর্চার ইতিহাসে ১৯০৬ সালের এই প্রকাশনাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয় এবং গ্রন্থটি দীর্ঘকাল জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
গ্রন্থটির ব্যাপ্তি বোঝা যায় এর প্রথম সংস্করণের আয়তন থেকেই—১,৪৯৩ পৃষ্ঠা। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ১৯০৬ সালের গ্রন্থতালিকায় এটিকে A comprehensive Bengali Dictionary হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নামের মধ্যে ‘সরল’ থাকলেও কাজের পরিসরে এটি মোটেই ছোট বা সাধারণ অভিধান ছিল না।
উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় অভিধান রচনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ দেখা গেলেও অধিকাংশ অভিধান ছিল বাংলা-ইংরেজি বা ইংরেজি-বাংলা ধরনের। বিশ শতকের শুরু থেকে বাংলা-বাংলা অভিধানের আধুনিক রূপ বিকশিত হতে থাকে। এই ধারায় ১৯০৬ সালের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ বিশেষ স্থান অধিকার করে। পরবর্তী সময়ে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ এই ধারাকে আরও বিস্তৃত করে।
অভিধানটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার বহুমুখী তথ্যসম্ভার। এটি শুধু শব্দের অর্থ জানানোর অভিধান নয়। বাংলা শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তির পাশাপাশি ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, বৈজ্ঞানিক ও পৌরাণিক তথ্য, জীবনচরিত, সংস্কৃত ও বাংলা গ্রন্থের পরিচয়, উপন্যাস ও নাটকের চরিত্র, বৈষ্ণব পদাবলীর অর্থ, প্রবাদ-প্রবচন, আদালতি ও মহাজনি শব্দ এবং স্বরলিপির সংকেত পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর বাস্তব উদাহরণও অভিধানের পাতায় দেখা যায়। ‘অই’ শব্দের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ নয়, শব্দটির উৎস, বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ এবং পদ্য ও ছন্দের ক্ষেত্রে তার ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে। ‘অংশুক’ শব্দে আবার বস্ত্র, উত্তরীয়, সূক্ষ্মবস্ত্র, ঘাগরা, শায়া এবং তেজপাতা—এমন একাধিক অর্থ ও ব্যুৎপত্তিগত তথ্য পাওয়া যায়।
এই অভিধানের আরেকটি মূল্যবান দিক হলো পুরনো বাংলা ভাষার রূপ সংরক্ষণ। আজকের প্রচলিত ভাষায় যেসব শব্দ, অর্থ বা প্রয়োগ অচেনা, সেগুলোর অনেকটাই এই অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে এটি শুধু সমকালীন পাঠকের শব্দার্থ-সহায়ক নয়; পুরনো বাংলা সাহিত্য, দলিল, পুঁথি ও ঐতিহাসিক রচনা পাঠের ক্ষেত্রেও গবেষণামূলক সহায়তা দিতে পারে।
সুবলচন্দ্র মিত্রের জীবন সম্পর্কেও তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৮৭২ সালে কলকাতায় এবং মৃত্যু ১৯১৩ সালে। অভিধান রচনার পাশাপাশি তিনি অনুবাদক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর অনূদিত কলিকাতার ইতিহাস ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয়।
‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’-এর জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রমাণ এর পরবর্তী সংস্করণগুলো। ১৯৩৬ সালে সপ্তম সংস্করণ এবং ১৯৬০ সালে অষ্টম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ সালের সংস্করণটিও এখন ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত আছে এবং সেখানে অভিধানের বিপুল শব্দভাণ্ডারের প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ শুধু শব্দের অর্থ খোঁজার বই নয়; এটি বিংশ শতকের গোড়ার বাংলা ভাষা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। শব্দের অর্থের সঙ্গে ব্যুৎপত্তি, প্রয়োগ, ইতিহাস, সাহিত্য, পুরাণ ও নানা আনুষঙ্গিক তথ্যকে একই অভিধানের পরিসরে আনার সুবলচন্দ্রের প্রয়াসই গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। বাংলা ভাষার পুরনো শব্দভাণ্ডার ও অভিধান-রচনার ইতিহাস জানতে আগ্রহী পাঠক ও গবেষকের কাছে তাই বইটির গুরুত্ব আজও অম্লান।
গ্রন্থটির ব্যাপ্তি বোঝা যায় এর প্রথম সংস্করণের আয়তন থেকেই—১,৪৯৩ পৃষ্ঠা। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের ১৯০৬ সালের গ্রন্থতালিকায় এটিকে A comprehensive Bengali Dictionary হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নামের মধ্যে ‘সরল’ থাকলেও কাজের পরিসরে এটি মোটেই ছোট বা সাধারণ অভিধান ছিল না।
উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় অভিধান রচনার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ দেখা গেলেও অধিকাংশ অভিধান ছিল বাংলা-ইংরেজি বা ইংরেজি-বাংলা ধরনের। বিশ শতকের শুরু থেকে বাংলা-বাংলা অভিধানের আধুনিক রূপ বিকশিত হতে থাকে। এই ধারায় ১৯০৬ সালের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ বিশেষ স্থান অধিকার করে। পরবর্তী সময়ে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ এই ধারাকে আরও বিস্তৃত করে।
অভিধানটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার বহুমুখী তথ্যসম্ভার। এটি শুধু শব্দের অর্থ জানানোর অভিধান নয়। বাংলা শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তির পাশাপাশি ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, বৈজ্ঞানিক ও পৌরাণিক তথ্য, জীবনচরিত, সংস্কৃত ও বাংলা গ্রন্থের পরিচয়, উপন্যাস ও নাটকের চরিত্র, বৈষ্ণব পদাবলীর অর্থ, প্রবাদ-প্রবচন, আদালতি ও মহাজনি শব্দ এবং স্বরলিপির সংকেত পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর বাস্তব উদাহরণও অভিধানের পাতায় দেখা যায়। ‘অই’ শব্দের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ নয়, শব্দটির উৎস, বিভিন্ন অর্থে প্রয়োগ এবং পদ্য ও ছন্দের ক্ষেত্রে তার ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হয়েছে। ‘অংশুক’ শব্দে আবার বস্ত্র, উত্তরীয়, সূক্ষ্মবস্ত্র, ঘাগরা, শায়া এবং তেজপাতা—এমন একাধিক অর্থ ও ব্যুৎপত্তিগত তথ্য পাওয়া যায়।
এই অভিধানের আরেকটি মূল্যবান দিক হলো পুরনো বাংলা ভাষার রূপ সংরক্ষণ। আজকের প্রচলিত ভাষায় যেসব শব্দ, অর্থ বা প্রয়োগ অচেনা, সেগুলোর অনেকটাই এই অভিধানে খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে এটি শুধু সমকালীন পাঠকের শব্দার্থ-সহায়ক নয়; পুরনো বাংলা সাহিত্য, দলিল, পুঁথি ও ঐতিহাসিক রচনা পাঠের ক্ষেত্রেও গবেষণামূলক সহায়তা দিতে পারে।
সুবলচন্দ্র মিত্রের জীবন সম্পর্কেও তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৮৭২ সালে কলকাতায় এবং মৃত্যু ১৯১৩ সালে। অভিধান রচনার পাশাপাশি তিনি অনুবাদক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর অনূদিত কলিকাতার ইতিহাস ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হয়।
‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’-এর জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রমাণ এর পরবর্তী সংস্করণগুলো। ১৯৩৬ সালে সপ্তম সংস্করণ এবং ১৯৬০ সালে অষ্টম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ সালের সংস্করণটিও এখন ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত আছে এবং সেখানে অভিধানের বিপুল শব্দভাণ্ডারের প্রত্যক্ষ পরিচয় পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ শুধু শব্দের অর্থ খোঁজার বই নয়; এটি বিংশ শতকের গোড়ার বাংলা ভাষা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। শব্দের অর্থের সঙ্গে ব্যুৎপত্তি, প্রয়োগ, ইতিহাস, সাহিত্য, পুরাণ ও নানা আনুষঙ্গিক তথ্যকে একই অভিধানের পরিসরে আনার সুবলচন্দ্রের প্রয়াসই গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। বাংলা ভাষার পুরনো শব্দভাণ্ডার ও অভিধান-রচনার ইতিহাস জানতে আগ্রহী পাঠক ও গবেষকের কাছে তাই বইটির গুরুত্ব আজও অম্লান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।