##########
বাংলা ভাষার অভিধানচর্চার ইতিহাসে রাজশেখর বসুর ‘চলন্তিকা’ একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এর প্রথম প্রকাশ ১৯৩৭ সালে। অভিধানটির উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বাংলা ভাষায় প্রচলিত শব্দের সহজ, সংক্ষিপ্ত ও ব্যবহারিক অর্থ দেওয়া—বিশেষত বাংলা সাহিত্য পাঠ ও লেখালেখির প্রয়োজন মেটানো। গ্রন্থটির নাম ‘চলন্তিকা’ও যথার্থ; ‘চলন্ত’ অর্থাৎ চলতি বা প্রচলিত ভাষার অভিধান হিসেবেই এটি পরিকল্পিত হয়েছিল।
রাজশেখর বসু (১৮৮০–১৯৬০) বাংলা সাহিত্যে ‘পরশুরাম’ ছদ্মনামে বিখ্যাত হলেও তাঁর কর্মজীবন ছিল বহুমুখী। তিনি রসায়নবিদ, বিজ্ঞানলেখক, অনুবাদক, ভাষাবিশারদ ও সাহিত্যিক। বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক ও পারিভাষিক শব্দ নির্মাণেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের নিয়ম নির্ধারণের জন্য যে কমিটি গঠন করে, রাজশেখর বসু তার সভাপতির দায়িত্ব পান।
এই অভিধান তৈরির সময় তিনি বাংলা বানানের বৈচিত্র্য ও অসংগতিও গভীরভাবে বিবেচনা করেছিলেন। বানানকে আরও সুসংবদ্ধ করার জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র রায় প্রমুখ বিশিষ্ট লেখকের মতামতও নিয়েছিলেন। ফলে ‘চলন্তিকা’ শুধু শব্দের অর্থের অভিধান নয়, বাংলা বানান ও ভাষাব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলও।
‘চলন্তিকা’র সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ব্যবহারিক চরিত্র। বিশাল শব্দভাণ্ডারের ভারে পাঠককে বিপর্যস্ত না করে সাহিত্যপাঠে যে শব্দগুলোর অর্থ জানা প্রয়োজন, সেগুলোকে সহজভাবে উপস্থাপন করাই ছিল এর লক্ষ্য। বিশেষ করে পুরনো বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে পাঠক যে অপ্রচলিত বা দুর্বোধ্য শব্দের মুখোমুখি হন, সেগুলোর অনেকগুলিও অভিধানটিতে রাখা হয়েছে। ফলে এটি একই সঙ্গে আধুনিক ও ঐতিহ্যসচেতন অভিধান।
গ্রন্থটির ব্যাপ্তিও যথেষ্ট। বিভিন্ন সংস্করণে এর আয়তন পরিবর্তিত হয়েছে; কলকাতার এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স-এর একটি সংস্করণের গ্রন্থাগার-তথ্যে ৮২৮ পৃষ্ঠা পাওয়া যায়, আর পরবর্তী একটি সংস্করণে ৮৪০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ত্রয়োদশ সংস্করণের তথ্যও গ্রন্থাগার-তালিকায় রয়েছে।
‘চলন্তিকা’র আরেকটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব হলো, এটি বাংলা ভাষায় একভাষিক আধুনিক অভিধানচর্চাকে জনপ্রিয় করে তোলে। রবীন্দ্রনাথও অভিধানটির প্রশংসা করেছিলেন এবং এর সঙ্গে থাকা বাংলা ব্যাকরণের সংক্ষিপ্ত পরিশিষ্টের বিশেষ মূল্য স্বীকার করেছিলেন।
আজ বাংলা ভাষার অভিধানের সংখ্যা অনেক এবং ডিজিটাল অভিধানও সহজলভ্য। তবু ‘চলন্তিকা’র গুরুত্ব কমেনি। শব্দের অর্থ, বানান, ভাষার চলতি রূপ এবং সাহিত্যপাঠের প্রয়োজন—এই চারটি বিষয়কে একত্রে বিবেচনা করাই এর প্রধান সাফল্য। বাংলা ভাষার আধুনিক রূপ নির্মাণের ইতিহাস বুঝতে এবং পুরনো-নতুন বাংলা শব্দের ব্যবহার জানতে ‘চলন্তিকা’ তাই আজও একটি মূল্যবান ভাষাতাত্ত্বিক সম্পদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।