একটি কল্যাণকর দুর্ঘটনা- সেলিনা শাহজাহান ও শাহজাহান তপন
-----------------------
শিশু-কিশোরদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার জন্য সেলিনা শাহজাহান ও শাহজাহান তপনের ‘একটি কল্যাণকর দুর্ঘটনা’ একটি চমৎকার বিজ্ঞানবিষয়ক বই। বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৮৬ সালে, ঢাকার মুক্তধারা থেকে। ১০৪ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নানা মজার ঘটনা গল্পের ঢঙে উপস্থাপিত হয়েছে।
বইটির নামকরণ হয়েছে এর প্রথম রচনার একটি বিস্ময়কর ঘটনা থেকে। ১৮২২ সালের ৬ জুন আমেরিকার মিশিগান অঞ্চলের ম্যাকিনঅ দ্বীপে ১৯ বছর বয়সী অ্যালেক্সিস সেন্ট মার্টিন দুর্ঘটনাবশত বন্দুকের গুলিতে গুরুতর আহত হন। তাঁর পাকস্থলীতে একটি স্থায়ী ছিদ্র তৈরি হয়। চিকিৎসক উইলিয়াম বিউমন্ট এই অস্বাভাবিক ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান। সেই ছিদ্র দিয়ে সরাসরি পাকস্থলীর হজমপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে তিনি খাদ্য হজমে পাকস্থলীর রস ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লাভ করেন। একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা এভাবেই বিজ্ঞানের জন্য ‘কল্যাণকর’ হয়ে ওঠে।
এমন আরও বহু কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় বইটিতে রয়েছে। ‘বড়, কত বড়’ রচনায় অ্যান্টনি ভ্যান লিউয়েনহুকের লেন্স ও মাইক্রোস্কোপের ইতিহাসের মাধ্যমে অদৃশ্য ক্ষুদ্র জগতকে মানুষের চোখের সামনে এনে দেওয়ার কাহিনি বলা হয়েছে। ‘চলো যাই মহাশূন্যে’-তে রকেট, মাধ্যাকর্ষণ অতিক্রম এবং মহাকাশযাত্রার প্রাথমিক বিজ্ঞান সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ‘সৌরশক্তি’তে সূর্যের শক্তির ব্যবহার, আর ‘আঙুল দিয়ে গোনা’-য় প্রাচীন মানুষের গণনার কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।
‘আকাশ-তড়িৎ’ রচনায় বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের ঘুড়ি ও বজ্রবিদ্যুৎ নিয়ে বিখ্যাত পরীক্ষার গল্প রয়েছে। আবার ‘ঝড়-বাদলের কথা’য় বৃষ্টি, বায়ুচাপ, উচ্চচাপ-নিম্নচাপ, বাতাসের গতি ও আবহাওয়া মাপার যন্ত্র সম্পর্কে গল্পচ্ছলে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর বয়স, তেজস্ক্রিয় কার্বনের সাহায্যে বয়স নির্ণয়, সাগরতলের প্রাণী এবং এক্স-রে নিয়েও বইটিতে আলোচনা আছে।
বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো বিজ্ঞানকে ভয় পাওয়ার বিষয় না করে আনন্দ ও কৌতূহলের বিষয় করে তোলা। লেখকদ্বয় কঠিন বৈজ্ঞানিক তথ্যকে গল্প, ঘটনা ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে পরিবেশন করেছেন। ফলে শিশু-কিশোর পাঠক শুধু তথ্য মুখস্থ করে না; বরং ‘কেন?’ এবং ‘কীভাবে?’ প্রশ্ন করতে শেখে।
সব মিলিয়ে ‘একটি কল্যাণকর দুর্ঘটনা’ বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার একটি সফল প্রয়াস। আবিষ্কারের পেছনে কখনো দীর্ঘ গবেষণা, কখনো কৌতূহল, আবার কখনো আকস্মিক ঘটনা কীভাবে নতুন জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়—এই বই তারই আনন্দময় পাঠ। বিজ্ঞানপ্রেমী নতুন প্রজন্ম তৈরিতে বইটির গুরুত্ব এখানেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
প্রাসঙ্গিক মতামত করুন। অবাঞ্চিত মন্তব্যের যাবতীয় দায় মন্তব্যকারীর। অন্য কেউ নয়।